শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

টকশো পন্ডিত এবং সরকার সমীপে

জুলাই গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানের রক্তস্নাত দিনগুলো ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। তবে সেই দিনগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যারা সেদিন রাজপথে ছিলেন, তাদের চেতনার সাথে টকশো-কথকদের অনেকের ভাবনায় পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। টকশো কথকরা এখন তাদের দলীয় রাজনীতির আলোকে কথাবার্তা বলছেন, পান্ডিত্য প্রদর্শনেও কসুর করছেন না। কথায় কথায় তারা ইউনূস সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কথা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বলছেন। অন্তর্বর্তী সরকারকে অথর্ব আখ্যা দিয়ে তারা এভাবে কথা বলছেন, যেন টকশো পন্ডিতদের হাতে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করাটাই এখন সময়ের দাবি। গণঅভ্যুত্থানের তিন মাসের মধ্যেই এমন একটি বাতাবরণ সৃষ্টির প্রয়াসকে কী বলা যায়? এই প্রয়াস কি বস্তুনিষ্ঠ ও প্রাগ্রসর প্রয়াস, নাকি বুঝে-না বুঝে প্রতিবিপ্লবের অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তারা? তাহলে কি ইউনূস সরকারের কোনো ভুল নেই? দ্রব্যমূল্য কি বাড়ছে না? ভুলও আছে, দ্রব্যমূল্যও বাড়ছে। তাহলে সমালোচনায় ক্ষতি কোথায়? আসলে সমালোচনায় ক্ষতি নেই, ক্ষতি আছে প্রেক্ষাপট বিচ্যুৎ সমালোচনায়। টকশোতে এখন অনেকেই ফ্যাসিবাদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন, কিন্তু ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে যাচ্ছেন না, ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন না এবং চিহ্নিত করছেন না অপরাধীদেরও। ফলে তাদের খন্ডিত ও একদেশদর্শী আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা অপরাধী ও অথর্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। আর দিন দিন কালিমামুক্ত হয়ে যাচ্ছেন ফ্যাসিবাদের দোসররা। অনেকেই এখন আবার প্রাপ্য শাস্তির বদলে ফ্যাসিবাদের মাস্তানদের সাথে গণতান্ত্রিক আচরণের উপদেশ খয়রাত করছেন। প্রতিবিপ্লবের কর্মকান্ড এখন ভালোই চলছে বাংলাদেশ।

আমরা আইনকে হাতে তুলে নেওয়ার কথা বলছি না। আমরা ন্যায়বিচারের কথা বলছি এবং যার যা প্রাপ্য তা বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলছি। সমস্যাটা দেখা দিয়েছে এখানেই। যার যা প্রাপ্য তা বুঝিয়ে দেওয়ার কাজটাতো করতে হবে সরকারকেই। কিন্তু সরকার কি সেভাবে কাজ করতে পারছে? পদে পদে এতো বাধা কেন? সচিবালয় ঘেরাও, আনসার বিদ্রোহ, গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা, বঞ্চিত বিভিন্ন পক্ষের সড়ক অবরোধ, নিত্যপণ্যে সিন্ডিকেট, পেশাজীবীদের আন্দোলন। এখন আবার যুক্ত হয়েছে সংখ্যালঘু কার্ড। সনাতনীরাতো চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা অভিযানের হুমকি দিয়েছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের তিন মাসের পরিসরে নানা নামে যত দাবি-দাওয়া ও হুমকির বার্তা লক্ষ্য করা গেছে, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের à§§à§« বছরে তার সিকিভাগও লক্ষ্য করা যায়নি। এসব কিসের আলামত? এসব যদি প্রতিবিপ্লব কিংবা ষড়যন্ত্রের আলামত না হয়, তাহলে কিসের আলামতÑটকশোর পন্ডিতরা একটা বিশ্লেষণ করবেন কী?

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের কর্মকান্ডের আলোচনা-সমালোচনা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা এখন কোন সমাজে দাঁড়িয়ে আছি, আমাদের পাটাতনটা কেমন? আমাদের সমাজটাতো টকশোর শীতল কক্ষ নয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পলায়নের সময় দেশটাকে কোথায় রেখে গিয়েছিল? দেশের আদালত, বিচার ব্যবস্থা, আইন পরিষদ, সচিবালয়, প্রশাসন কি জনগণের জন্য ছিল, গণতন্ত্রসম্মত ছিল? ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা ও অর্থলুণ্ঠনের চিত্র কেমন ছিল? দেশটা ধসে পড়ার সব আয়োজনই ফ্যাসিস্ট সরকার করে রেখেছিল। এখন হাসিনা সরকারকে সামনে না পেয়ে সব ক্ষোভ ও দোষ কি ইউনূস সরকারের ঝুলিতে রাখতে হবে? আমরা বলতে চাইছি, যথা বিষয়কে যথাস্থানে রাখুন। উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে রাখলে চলবে না। টকশোর পন্ডিতরা অবশ্যই ইউনূস সরকারের সঙ্গত সমালোচনা করবেন, তবে প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কেও তাদের সচেতন থাকতে হবে। ইউনূস সরকার সমীপেও কিছু নিবেদন আছে। ষড়যন্ত্র আছে, তবে সবকিছুকে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’  দিয়ে বিবেচনা করলে চলবে না। আরও খোলামেলা হোন, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কথা বলুন। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দেশ ও জনগণের জন্য যা কল্যাণকর বলে বিবেচিত হবে, তা বাস্তবায়নে অটল থাকুন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভাঙ্গাসহ যা যা করা প্রয়োজন তা সম্পন্ন করতে হবে দৃঢ়চিত্তে। ছাত্র-জনতা আপনাদের দেশ পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। এখানে দুর্বলতা বা সিদ্ধান্তহীনতার কোনো সুযোগ নেই। সময় কম, কাজ অনেকÑতাই অন্তর্বর্তী সরকারকে আরও গতিশীল করতে জুলাই বিপ্লবের চেতনাসমৃদ্ধ যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে সরকারের কলেবর বৃদ্ধি করুন। কারণ জনগণ দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়, নির্বাচনে যেতে চায়। সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে সরকারের কাজ শুরু করেছিলেন, এখন তো পথে পথে বাধা। ভিতরের এবং বাইরের বাধা জয় করেই দেশপ্রেমিক সরকারকে এগিয়ে যেতে হয়। সেভাবে এগিয়ে গেলে জনগণ আপনাদের সাথেই থাকবে। জনতার ঐক্য অপরাজেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ